বর্তমানে হিন্দুদের টিপু সুলতানের বিরোধীতা এবং টিপু সুলতানের সম্পর্কে কিছু কথা

আপনারা নিশ্চয়ই খবর পেয়েছেন,
ভারতের কর্নাটকে উগ্রহিন্দুরা খুব আন্দোলন করছে। তাদের দাবি, সেখানে তারা কিছুইতে মহীশুরের শেষ মুসলিম শাসনকর্তা টিপু সুলতানের জন্মবার্ষিকী পালন করতে দেবে না। ইতিমধ্যে এই আন্দোলন করতে গিয়ে এক বিশ্বহিন্দু পরিষদের এক নেতাও মারা গেছে।
খবর বলছে, গতকাল মঙ্গলবার সরকারিভাবে আয়োজিত টিপু সুলতানের জন্মবার্ষিকী পালন অনুষ্ঠান বয়কট করে বিজেপি এবং অন্যরা। রাজ্যের বিজেপি প্রেসিডেন্ট প্রহ্ললাদ জোশির দাবি,টিপু সুলতান ধর্মান্ধ এবং কন্নড় বিরোধী ছিলেন। রাজ্যের কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী সিদ্দারামাইয়া অবশ্য বলেন, ‘টিপু সুলতানের বিরুদ্ধে ধর্মান্তরকরণের কোনো প্রমাণ নেই। যদি তিনি হিন্দু বিরোধী হতেন তাহলে আমাদের সকলকে রক্ষা করতেন না। তিনি কর্ণাটকের মহীশূরের মন্দির রক্ষা করেছিলেন। তিনি ছিলেন মহান দেশপ্রেমিক এবং নিজের ভুমিকে তিনি ভালবাসতেন।’ এদিকে টিপু সুলতানের অনুষ্ঠানের বিরোধীতা করে স্থানীয় ক্যাথলিক খ্রিস্টানরাও বিশ্ব হিন্দু পরিষদের আন্দোলনে যোগ দিয়েছে।
(সূত্র: http://goo.gl/yojEHn)

মহীশুরের শেষ শাসনকর্তা টিপু সুলতান সম্পর্কে কিছু তথ্য সংক্ষেপে সন্নিবেশ করার চেষ্টা করছি-

১) টিপু সুলতান ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে ‍যুদ্ধ করেছিলেন। ১৭৯৯ সালের মহীশুরে টিপু সুলতানদের নিহত হওয়ার পরই ইংরেজরা নিশ্চিত হয়েছিলো তারা পুরো ভারতকে করায়ত্ব করতে পেরেছে। উল্লেখ্য ইংরেজরা নয়, টিপু সুলতানের খুব কাছের লোকদের বিশ্বাসঘাতকতার কারণেই টিপু সুলতানকে নিহত হতে হয়।

২) টিপু সুলতানকে বাংলাদেশের মানুষ যেভাবে চেনে, আসলে ভারতে তার পরিচিত অন্যভাবে। ভারতের মুসলমানরা টিপু সুলতানকে শুধু শাসক বা যোদ্ধা হিসেবে নয়, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বও হিসেবে চিনে। এজন্য ভারতীয় মুসলমানরা তার নামের আগে ‘হযরত’ এবং পরে ‘রহঃ’ শব্দ খানা যোগ করেন।

৩) টিপু সুলতান সাধারণ কোন ব্যক্তি ছিলেন না। তিনি যুদ্ধবিদ্যায় অসম্ভব পারদর্শী ছিলেন। তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যে নিখুত যুদ্ধ প্ল্যান তৈরী করতে পারতেন, যা বর্তমান সময়ে চিন্তা করা অসম্ভব।

৪) টিপু সুলতান সর্বপ্রথম জ্বালানি সমৃদ্ধ রকেট বা মিসাইল প্রযু্ক্তি ব্যবহার করেন। তিনি জ্বালানি সমৃদ্ধ কোনো ধাতব বস্তুকে ত্বরণ প্রয়োগে মধ্যাকর্ষণ শক্তির বিপরীতে ঊর্ধ্বে নিক্ষেপ করে সর্বাধিক অনুমিত নির্দিষ্ট দূরত্বে পাঠাতে সক্ষম হন। অর্থাৎ লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁতভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হন। তিনি ‘ফাতহুল মুজাহিদিন’ নামে একটি মিলিটারি ম্যানুয়াল (পত্রিকা) লিখেন  ; যেখানে পৃথিবীতে সর্বপ্রথম জ্বালানি রকেট-এর ব্যবহারবিধি এবং একাধিক রকেট লাঞ্চার কিভাবে ব্যবহার করতে হবে তা বর্ণনা করেছেন। পরবর্র্তীতে এ প্রযুক্তিটি ব্রিটিশ দস্যুরা চুরি করে নিয়ে যায়। এই নতুন বিষয় পেয়ে  দস্যু ব্রিটিশরা তাদের গবেষণাগার ‘উল্ভিচ ওয়ারেন’-এ ‘রকেট প্রযুক্তির উপর বিস্তর গবেষণা’ শুরু করে এবং ‘রকেট প্রযুক্তির উন্নয়ন’-এর জন্য ব্যবহার করে।

৫) টিপু সুলতান নতুন সৌর ক্যালেন্ডার-এর উদ্ভাবন করেন, নতুন মুদ্রা প্রথার প্রচলন করেন, নতুন ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থার প্রচলনসহ আরো অসংখ্য জিনিস উদ্ভাবন করেন। ভারত উপমহাদেশে তিনিই সর্বপ্রথম উর্দু পত্রিকা প্রকাশ করেন। ‘ফাতহুল মুজাহিদীন’ নামে প্রকাশিত সাপ্তাহিক পত্রিকাটি তার তত্ত্ববধানে প্রকাশিত হত এবং এতে মুসলিম মুজাহিদদের দায়িত্ব ও করণীয় সম্পর্কে উল্লেখ থাকত।

৬) আমার কাছে টিপু সুলতানদের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষনীয় ঘটনা মনে হয়েছে ভূমির স্বাধীনতা ও প্রজাদের নিরাপত্তার জন্য নিজ প্রাণপ্রিয় পুত্রদের ইংরেজদের কাছে বন্ধক রাখা। ঐ সময় তার প্রজারা অবাক হয়ে বলেছিলো- “আপনার পুত্রদের জন্য আমরা জীবন দিতে প্রস্তুত, আর আমাদের মত নগ্যে প্রজাদের জন্য আপনি কিনা পুত্রদের বন্ধক দিলেন ?”

৭) ইংরেজরা একমাত্র তার প্রতিরোধের কারণেই গোটা হিন্দুস্তান কব্জা করতে ব্যর্থ হচ্ছিল। একারণে তারা তাঁর বিরুদ্ধে মরিয়া হয়ে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়।  মহীশুর বাহিনীর সাথে ইংরেজ বাহিনীর ফয়সালাকারী যুদ্ধ সংঘটিত হয় ১৭৯৯ সালের মে মাসে। ৪ মে টিপু সুলতান শত্রু বাহিনীর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হন। বিশ্বাসঘাতক পরিবেষ্টিত হয়ে তাকে যুদ্ধ করতে হয়। এমনকি তার ব্যক্তিগত সহচর গোলাম রাজা খানও তার সাথে চরম বিশ্বাসঘাতকতা করে। তার কাছে পানি থাকা স্তত্বেও সুলতানকে পানি দিতে অস্বীকার করে এবং সুলতান সারা দিন পানির পিপাসায় ছটফট করেন। এই বিশ্বাসঘাতক সুলতানকে ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পনের কুপরামর্শ দেয়। সে সময় তাকে লক্ষ্য করেই টিপু সুলতান সেই বিখ্যত উক্তিটি করেন- “আমার কাছে সিংহের একদিন জীবন শিয়ালের শত বছরের জীবনের চেয়ে উত্তম।”

টিপু সুলতানের জীবনী থেকে হিন্দু-মুসলিম সবাই দেশপ্রেমে অনুপ্রাণিত। অথচ তার মত এক মহান শাসকের বিরুদ্ধে বর্তমানে লেগেছে ভারতীয় উগ্রহিন্দুরা, যা সত্যিই লজ্জাজনক। অথচ বর্তমানে হিন্দুরাই ইংরেজ দালাল, লুটেরা দস্যু শিবাজীর অনুষ্ঠান খুব ভালোভাবে উদযাপন করে। উগ্র হিন্দুদের এ ধরনের নিকৃষ্ট মনমানসিকতায় আর পরিবর্তন আসবে বলে মনে হয় না।

টিপু সুলতানের সময়কার ইতিহাস জানার জন্য নিচে দুটো ধারাবাহিক বইয়ের পিডিএফ লিঙ্ক দিলাম, পড়ে দেখতে পারেন-
১) https://goo.gl/Nm8mW4
২) https://goo.gl/204iL8

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s