সত্যিই কি মুসলমানরা ইউরোপ গিয়ে ইউরোপকে কলুষিত করছে ??

আজকাল কিছু নাস্তিক ব্লগার বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ যায়, আর ফেসবুকে স্ট্যাটাস মারে, “ইস ! মুসলমানরা কত নৃশংস, কত জঘন্য, কত বর্বর। ইউরোপীরা কত সভ্য, কত ঐতিহ্যবাহী, কত উদারমনা। আরবের মুসলমানরা এসে ইউরোপটা নষ্ট করে দিলো, নোংরা করে দিলো, বর্বরতা ছড়িয়ে দিলো। মুসলমানদের ঘাড় ধরে ইউরোপ থেকে বের করে দেওয়া উচিত।”

যে সকল মূর্খ সামান্য কিছু টাকা আর অ্যাসাইলামের লোভে এ ধরনের বক্তব্য দেয়, তাদের উচিত ইতিহাস সম্পর্কে কিছু জ্ঞান লাভ করা। কারণ তারা যদি ইতিহাস সম্পর্কে নূন্যতম জ্ঞান রাখতো , তবে এ ধরনের কথা কখনই বলতে পারতো না, বরং বলতো- আরবের সভ্য মুসলমানরা এসে অসভ্য, বর্বর, নৃশংস ইউরোপীয়দের সভ্যতা শিখিয়েছে, তাদের ভদ্র বানিয়েছে।
মূলতঃ মুসলমানদের সংস্পর্শে আসার আগ পর্যন্তু ইউরোপীয়রা ছিলো জঘন্য নৃশংস, বর্বর ও অসভ্য। মধ্যযুগে মুসলমানরা যখন ইউরোপ দখল করলো অথবা কয়েকশ’ বছর আগে ইউরোপীয়রা যখন নতুন করে মুসলমানদের সংস্পর্শে আসলো, তখন তারা বুঝলো সভ্যতা কাকে বলে, মানবতা কাকে বলে। বলাবাহুল্য বর্তমানে ইউরোপীয়রা যে মানবতা ও সভ্যতার বুলি মুখ দিয়ে বলে সেটাও মুসলমানদের থেকেই শেখা, নয়ত মানবতা কিংবা অমানবিকতা, সভ্যতা কিংবা অসভ্যতার মাঝে যে তফাৎ আছে সেটাই তারা জানতো না।

ইউরোপীরা যে জাতিগত অসভ্য আর বর্বর ছিলো সেটার জন্য অনেক উদাহরণ দেওয়া যায়। তবে আমি একটি মাত্র উদাহরণ নিয়ে আসবো, সেটা হলো বন্দী, অধিনস্ত নারী কিংবা প্রতিপক্ষের উপর টর্চার সিস্টেম। আজ থেকে কয়েকশ’ বছর আগেও ইউরোপীরা যে সিস্টেমে টর্চার করতো তা বর্তমান সময়ে কোন সুস্থ মানুষ চিন্তাও করতে পারবে না। একমাত্র জাতিগত অসভ্য বর্বরদের পক্ষেই তা করা সম্ভব।  ইউরোপীয়দের সেই জঘণ্য টর্চার পদ্ধতি নিয়ে আজ আমার  এ নোট—-

১. ব্রাজেন বুল (Brazzen Bull)
 শুনলে ভয় পাবেন নিশ্চিত!! অত্যান্ত অমানবিক,অমানুষিক এবং পৈচাশিক একটি ডিভাইস, নাম ব্রাজেন বুল। প্রাচীন গ্রীকরা এর উদ্ভাবক। এটি একটি পিতলের তৈরি ডিভাইস যেটির আকৃতি ষাঁড়ের মত। এর পিঠে একটি ঢাকনা রয়েছে যেটি দিয়ে ভিক্টিম কে ষাঁড়ের পেটের ভিতর জোর করে ঢুকানো হত এবং ঢাকনাটি বন্ধ করে দেওয়া হত। তারপর এর পেটের নিচে আগুন দেওয়া হত। পুড়ে কাবাব হয়ে মারা যেত ভিকটিম।
 ষাঁড়ের মুখে থাকতো একটি প্যাঁচানো পিতলের পাইপ, যেটি ভিকটিমের আর্তনাদকে ভয়ংকর অমানুষিক একটি ধ্বনিতে রুপান্তরিত করতো। গ্রীকরা তাদের বাৎসরিক ব্যাংকুয়েটে (বিশাল ভোজ সভা) আমন্ত্রিত অতিথিদের এই ব্রাজেন বুলের চিৎকার শুনাতো। মধ্যযুগে (৫০০ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দ) ইউরোপীয়ানরা এ টর্চার সিস্টেম ব্যবহার করতো।

২. গ্যারোটি (Garrote)
 আরেকটি অমানবিক ডেথ ডিভাইস। স্ক্রু মেকানিজমের উপর ভিত্তি করে এটি তৈরি হয়েছে। এক্ষেত্রে ভিকটিমকে একটি চেয়ারের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা হয়। ভিকটিমের ঘাড়ের পিছনে একটি সুচালো স্ক্রু থাকে যেটিকে একটি হ্যান্ডেল দিয়ে ঘুরানো হয়। এর ফলে স্ক্রু টি ভিকটিমের স্পাইনাল কর্ডকে মস্তিস্ক থেকে আলাদা করে দেয়। মৃত্যু নেমে আসে খুব দ্রুত!!!
১৭শ’-১৮শ’ শতাব্দীতে এই যন্ত্রের ব্যবহার সবচেয়ে বেশি হযেছে। আজ থেকে ৭০-৮০ বছর পূর্বে ফরাসী সৈন্যরা এই সিস্টেমে নিঃশব্দে মানুষ মারতো।

৩. র‌্যাক (Rack)

ফরাসীরা এটি আবিস্কার করেছিল। এটি একটি টর্চার ডিভাইস, সাধারনত একটি কাঠের ফ্রেম দ্বারা নির্মিত। এর দুই দিকে দুটি লিভার অর্থাৎ হাতল থাকে। এবং চিত্রের মত এতে দড়ি লাগানো থাকে। মানুষটিকে মেশিনের মাঝের টেবিলে শোয়ানো হত আর দুই দিকের দড়ির দুই প্রান্ত ভিকটিমের দুই হাত এবং দুই পা এর সাথে বাধা থাকতো। এ কাজের জন্য দুটি জল্লাদ লাগতো। তারা দুই দিকের দুটি লিভার ধরে টান দিতো এবং তাদের প্রয়োগকৃত বল লিভারের কারনে কয়েকগুণ বেশি হয়ে প্রয়োগ হত এবং ভিকটিমের অসহ্য যন্ত্রনা শুরু হত। প্রথমে তাদের হাত পা এর লিগামেন্ট গুলো ছিড়ে যেত এবং পরে সেগুলো সকেট থেকে খুলে আসত। প্রচন্ড ব্যাথা আর রক্ত ক্ষরনে ভিকটিমের যন্ত্রনাদায়ক একটি মৃত্যু ঘটত।
 ইতালিয়ানরা এর একটি উন্নত সংস্করণ তৈরি করেছিলো, যেটির টেবিল ছিলো কাটা যুক্ত। এর ফলে ভিকটিমের যন্ত্রনা আরো বেড়ে যেত, মৃত্যু হত আরো ভয়ংকর।

৪. Iron Maiden
আরেকটি ভয়ংকর টর্চার ডিভাইস হচ্ছে আয়রন মেইডেন!!! এক অনন্য হত্যাকারী। এটি একটি কুঠুরী বিশেষ। এর দুটি দরজা আছে।
কুঠুরির ভেতর এবং প্রত্যেকটি দরজায় অসংখ্য লম্বা লম্বা কাটা আছে।
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামীকে প্রথমে জোর করে এর কুঠুরির ভেতর ঢুকানো হত। তারপর বন্ধ করে দেওয়া হত সেই মারন দরজা দুটি। ভিকটিমের গুরুত্বপুর্ন অঙ্গ প্রত্যঙ্গ গুলির মাঝ দিয়ে ঢুকে যেত কাটা গুলি। প্রবল যন্ত্রনায় এবং রক্তপাতে ভিকটিমের মৃত্যু হত কিছুক্ষন বাদেই………….

৫. Chastity Belt (সতীত্ব বন্ধনী)
আজকাল অনেকেই বলে আরব মুসলিমরা নাকি নারীদের অধিকার দেয় না। তাদেরকে ঘরের মধ্যে, বোরকার মধ্যে আটকিয়ে রাখে। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে ইউরোপীয়রা তাদের নারীদের এত জঘন্যভাবে আটকে রাখতো, যা এখনকার মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। ছবিতে দেখতে পাচ্ছেন, তালাযুক্ত লোহার তৈরি মেয়েদের একটি অর্ন্তবাস। ক্রুসেডারদের মধ্যে যারা নাইট তারা যুদ্ধে যাওয়ার আগে তাদের স্ত্রী এবং কন্যাকে এই লোহার অর্ন্তবাস পড়িয়ে দিয়ে যেত যাতে তারা অন্য কারো সাথে যৌন মিলন করতে না পারে।  দীর্ঘদিন পরিধানের ফলে অথবা তাদের স্বামী বা পিতা যুদ্ধে মারা গেলেও তারা এটি খুলতে পারত না এবং এর থেকে সৃষ্ট ক্ষত এবং পচনের ফলে তাদের মৃত্যু হত।

৬. Breast Ripper (স্তন উপড়ে ফেলার যন্ত্র)
ইউরোপের খ্রিস্টানরা নারীদের এ উপায়ে শাস্তি দেওয়া হতো। কোন নারী যদি ব্যভিচার, গর্ভপাত, ধর্মঅবমাননা করতো কিংবা অভিযুক্ত হতো ডাইনী হিসেবে তবে তার স্তনকে ব্রেস্ট রিপারের সাহায্যে তুলে ফেলে হত্যা করা হতো।

৭. Guillotine বা গিলেটিন
 এটি ফরাসিদের তৈরি আরেকটি ভয়ংকর ডেথ ডিভাইস। ফরাসী বিপ্লবের সময় মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত আসামীদের সংখ্যা প্রচুর হারে বাড়তে লাগলো। সেক্ষেত্রে তারা একটি মেশিনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলো যেটা দিয়ে আরো দ্রুত মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা যায়, যে ভাবা সেই কাজ।
ফরাসী প্রকৌশলীরা বানীয়ে ফেলল এমন একটি মারন ডিভাইস যেটি দিয়ে খুব দ্রুত এবং অধিক হারে মৃত্যুদন্ড কার্যকর করা যেত। সেটি হচ্ছে গিলেটিন।

৮. Flaying Knives (জীবন্ত চামড়া ছিলা)
জীবন্ত অবস্থায় চামড়া ছিলে ফেলা। ই্উরোপীয় খ্রিস্টানদের মধ্যে এ প্রথা অনেক আগে থেকেই দেখা যায়, ১৮শ’ শতাব্দীতে ফরাসীদের মধ্যে এ প্রথায় মানুষ হত্যা করতে দেখা যায়।

৯. . Intestinal Crank  (আন্ত্রিক কল)
পেটের মধ্যে ফুটো করে নাড়িভুড়িকে রশি দিয়ে বাঁধা হয় পরে সেই রশিকে একটি কপি কলের সাথে লাগিয়ে কলটি ঘোড়ানো হয়। ফলে লোকটি জীবন্ত থাকা অবস্থায় তার নাড়িভুড়ি অবস্থায় বের হয়ে যায় এবং অনেক লম্বা এবং যন্ত্রণাদায়ক মৃত্যু হয়।

১০. Boiling Water (ফুটন্ত পানিতে সিদ্ধ করা)
এ পদ্ধতি অভিযুক্তকে ফুটন্ত পানিতে ফেলে দেওয়া হতো। ১৬শ’ শতাব্দীতেও এ প্রথা ইংল্যান্ডে চালু ছিলো।

১১. Iron Chair (লোহার চেয়ার)
এটি সম্পূর্ণ লোহার পেরেক দিয়ে মোড়ানো একটি চেয়ার। এখানে ৫০০-১৫০০ টি লোহার পেরেক থাকে। যাকে নির্যাতন করা হবে তাকে ঐ চেয়ারে বসিয়ে বেঁধে রাখা হয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে চেয়ারের নিচে ফাঁকা থাকে যেখানে উত্তপ্ত কয়লা রাখা হয়। – এই পদ্ধতিটি সাধারণত ব্যবহার করা হয় স্বীকারোক্তি আদায়ের ক্ষেত্রে।যার কাছ থেকে স্বীকারোক্তি নেওয়া হবে তাকে সামনে রেখে আরেকজনকে নির্যাতন করা হয় যাতে ভয়ে সে সবকিছু প্রকাশ করে। এই চেয়ারে যাকে বসানো হয় তার মৃত্য হবে অল্প অল্প করে রক্তক্ষরণে অনেক যন্ত্রণাদায়ক এবং দীর্ঘয়িত।

১২. Judas Cradle
এটাও আরেকটি ভয়ংকর এবং যন্ত্রনাদায়ক টর্চার ডিভাইস। জার্মান, ফ্রেঞ্চ, ইতালীয়রা ব্যবহার করতো। এক্ষেত্রেও ভিকটিম কে সম্পুর্ন উলঙ্গ করে তার পশ্চাৎদেশ অথবা গোপনাঙ্গ ত্রিকোনা আকৃতির সুচালো অংশটায় রাখা হয়। এবং ভিকটিমকে লোহার ফ্রেম দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে রাখা হয় যাতে সে নড়াচড়া করতে না পারে। ফলে খুব ধীরে ধীরে একটি যন্ত্রনাদায়ক মৃত্যু নিশ্চিত হত।

১৩. Death by sawing


মধ্যযুগে ইউরোপীয়রা এ সিস্টেম ব্যবহার করতো। এই সিস্টেমে একটি মানুষকে ঝুলিয়ে করাত দিয়ে কেটে দু’ টুকরো করা হতো।

এরকম আরো শত শত উদাহরণ আরো ইউরোপীয়দের বর্বরতার। ভারত উপমহাদেশে যেমন সভ্যতাহীন হিন্দুরা মুসলিমদের সংস্পর্শে এসে সভ্যতা শিখেছিলো, বাদ দিয়েছিলো নানান বর্বর ও কুপ্রথা (যেমন: সতীদাহ, সেবাদাসী, নরবলী) , ঠিক তেমনি ইউরোপীয়রাও মুসলমানদের সংস্পর্শে এসে সভ্যতা শিখেছিলো, ছাড়তে পেরেছিলো এ সকল বর্বরতা।

তাই যারা বলে আরবের মুসলমানরা এসে ইউরোপকে বর্বর করছে তারা গণ্ডমূর্খ ছাড়া কিছু নয়।

প্রয়োজনীয় সূত্র:
1. http://www.medievalwarfare.info/torture.htm
2. http://kknmedia.com/3707
3. http://io9.com/the-10-most-gruesome-torture-techniques-from-medieval-e-1626942115

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s